বাংলা নারীবাদ শব্দের ইংরেজি রূপ Feminism মূলত Feminine মূল থেকে উদ্ভূত। নারীবাদ বা ফেমিনিজম শব্দটির পারিভাষিক সংজ্ঞা নিয়ে তুমুল বিতর্ক রয়েছে। সংজ্ঞা নিয়ে এই মতপার্থক্যের মূল কারণ হচ্ছে স্থান ও কাল ভেদে নারীবাদী আন্দোলন একেক সময় একেক রূপ ধারণ করেছে এবং সময়ে সময়ে তাতে নানা বিবর্তন ও সংস্কার এসেছে। তবে সংজ্ঞা নিয়ে এই বিতর্ক সত্ত্বেও নারীবাদ বলতে যা বোঝায় তা হচ্ছে—নারীর ওপর পারিবারিক সহিংসতা ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করতে এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন করা।
প্রচলিত পশ্চিমা নারীবাদ ও ইসলামী নারীবাদের মূল চিন্তা ও দাবিতে তেমন কোনো পার্থক্য না থাকলেও দাবি-উপস্থাপন ও কর্মপন্থায় কিছু ভিন্নতা রয়েছে। লেবাননী গবেষক ও লেখিকা দিলাল বাজরি বলেন—'ইসলামী নারীবাদ পশ্চিমা নারীবাদের সমস্ত চিন্তাকে উত্তরাধিকার সূত্রে গ্রহণ ও নিজের ভেতর ধারণ করলেও তারা সেটা অস্বীকার করে বলে, এটা ইসলাম'। নারীবাদ যেমন প্রচলিত সমস্ত প্রথা ও ধর্মকে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে দাবি করে, যা যুগ যুগ ধরে নারীকে নিপীড়িত শোষিত ও বঞ্চিত করার জন্যই তৈরি হয়েছে। ইসলামী নারীবাদের দাবিও একই। তবে সমস্যার মোকাবেলায় পশ্চিমা নারীবাদ গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, স্বাধীনতা, সাম্য ইত্যাদির মতো লিবারেল ধারণাগুলোকে সামনে আনলেও ইসলামী নারীবাদ প্রাথমিকভাবে এর মোকাবেলা করতে চায় ভিন্নভাবে।
ইসলামী নারীবাদের স্তরসমূহ
ইসলামী নারীবাদের মতে কোরআন ও হাদিসের সমস্ত প্রচলিত ব্যাখ্যা হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যা। ফলে কোরআন ও হাদীসকে নারীবাদের আলোকে অধ্যয়ন ও পুনর্পাঠ করতে হবে এবং নারীবান্ধব নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হবে। এই দৃষ্টিকোণকে সামনে রেখে ইসলামী নারীবাদ নতুনভাবে কোরআন-হাদিসের পাঠ ও ব্যাখ্যা করতে চায়।
ড্যানিয়েল হাকিকাৎজু বর্ণনা করেছেন কীভাবে ইসলামী নারীবাদ একজন মানুষকে ধীরে ধীরে কুফর ও রিদ্দাহ পর্যন্ত নিয়ে যায়। তিনি পাঁচটি স্তর বর্ণনা করেন:
প্রথম ধাপ: কিছু যৌক্তিক অভিযোগ দিয়ে শুরু হয়, যেমন—মুসলিম পুরুষরা নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়, নারীরা নিপীড়িত। ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলো এ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না। লেখক মনে করেন, এসব সমস্যা অস্বীকার করা যায় না, তবে এর সমাধান নারীবাদ নয় বরং ইসলামের সঠিক জ্ঞান ও আইনের প্রতিষ্ঠা।
দ্বিতীয় ধাপ: অভিযোগগুলো মতাদর্শিক রূপ নেয়। যেমন—কনফারেন্সে কেন শুধু পুরুষ থাকবে, কেন নারীদের পর্দা ও শালীনতা বিষয়ে পুরুষরা বলবে। এ পর্যায়ে সমস্ত সমস্যার জন্য 'পুরুষতান্ত্রিকতাকে' দায়ী করা হয়। পর্দা, হিজাব এবং নারী-পুরুষের মেলামেশার মতো বিধানগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়।
তৃতীয় ধাপ: যখন দেখা যায় এসব বিধান শরীয়াহ নির্দেশিত, তখন ইসলামী জ্ঞানব্যবস্থা ও সিলসিলাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। স্কলারদের 'পুরুষতান্ত্রিক' আখ্যা দিয়ে নতুন 'নারীবাদী ধর্মতত্ত্ব' উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয়।
চতুর্থ ধাপ: দেখা যায় সরাসরি কোরআন ও হাদিসের টেক্সটেই এমন বিষয় আছে যা নারীবাদের মানদণ্ডে টিকে না। যেমন—সূরা নিসার ৩৪নং আয়াত (পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক), উত্তরাধিকার আইন, বা সাক্ষ্য প্রদানের নিয়ম। তখন সরাসরি ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়。
পঞ্চম ধাপ: সরাসরি স্রষ্টার ওপর নানা অভিযোগ তোলা হয় এবং ব্যক্তি চূড়ান্ত কুফর ও রিদ্দাহের দিকে পৌঁছে যায়।
লেখকের মতে, নারীবাদের ধারণা নিজেই একটা সমস্যা; একমাত্র সমাধান ইসলামই।
ইন্টারফেইথ বা আন্তঃধর্ম
বর্তমানে মুসলিমদের জন্য একটি বড় ষড়যন্ত্র ও ফিতনার নাম হচ্ছে ইন্টারফেইথ বা আন্তঃধর্ম। এটি ইন্টারফেইথ ডায়ালগ, ইন্টারফেইথ হারমোনি বা ইন্টারফেইথ এলিয়েন্স নামে প্রচারিত হতে পারে। এর শাব্দিক অর্থ "আন্তঃধর্মীয় সংলাপ", যার লক্ষ্য সকল ধর্মের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য সমঝোতা করা।
লেখক এটিকে মোঘল সম্রাট আকবরের "দ্বীন-ই-ইলাহি"র সাথে তুলনা করেছেন, যা সব ধর্ম মিলিয়ে এক কুফরি মিশ্রণ। ইন্টারফেইথ অনুযায়ী "সকল ধর্মই সঠিক"—এই ধারণাটি মেনে নিতে হয়। অথচ ইসলাম ব্যতীত অন্য সকল ধর্ম মানুষের তৈরি ও মিথ্যা।
বাস্তবিক প্রয়োগে ইন্টারফেইথ ও সেক্যুলারিজম একই জিনিস। তবে পার্থক্য হলো—সেক্যুলারিজম দাড়ি টুপিবিহীন লোকদের মাধ্যমে করানো হয়, কিন্তু ইন্টারফেইথ করানো হয় মসজিদের ইমাম, খতিব, মাদ্রাসার শিক্ষক ও স্কলারদের মাধ্যমে। কয়েকটি বিদেশী এনজিও বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাগুলোতে এই প্রজেক্ট প্রবেশের চেষ্টা করছে।
বিশ্বব্যাপী ইন্টারফেইথ প্রচারকারী কিছু সংগঠন:
Muslim Christian Dialogue Forum: পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ তাহির কাদরী এটি পরিচালনা করেন।
Interfaith Encounter Association (IEA): মধ্যপ্রাচ্যে (মিশর, ইরান, জর্ডান ইত্যাদি) কাজ করে।
Messiah Foundation International: প্রতিষ্ঠাতা রিয়াজ আহমেদ গোহার শাহী, যিনি নিজেকে ইমাম মাহদি ও মাসিয়াহ দাবি করেন।
Project Interfaith: যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক, প্রতিষ্ঠাতা বেথ কাটজ।
The Insight Film Festival (IFF): যুক্তরাজ্য ভিত্তিক, সিনেমা তৈরির মাধ্যমে কাজ করে।
United Religions Initiative (URI): যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক, ৮০টি দেশে কর্মরত।
Jordanian Interfaith Coexistence Research Center: জর্ডানে কর্মরত।
Global Peace Pioneers (GPP): পাকিস্তান ভিত্তিক।
মডারেট ইসলাম
'মডারেট মুসলিম' শব্দের আক্ষরিক অর্থ 'মধ্যপন্থী মুসলিম' হলেও পশ্চিমা বিশ্ব একে বিশেষ অর্থে ব্যবহার করে। ২০০৩ সালে মার্কিন থিংক ট্যাঙ্ক RAND Corporation "Civil Democratic Islam: Partners, Resources & Strategies" নামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে, যেখানে অ্যামেরিকার বৈশ্বিক পলিসির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক নতুন "মডারেট ইসলাম" বানানোর পরিকল্পনা করা হয়।
RAND রিপোর্টের মূল বিষয়সমূহ:
কেন এই নতুন ইসলাম প্রবর্তন করা উচিত।
একজন মডারেট মুসলিমের বৈশিষ্ট্য কী হবে।
কীভাবে মুসলিমদের মধ্যে এর প্রচার করা যায়।
রিপোর্টে পরামর্শ দেওয়া হয় যে, পুরনো ধারণাকে ভেঙে "পশ্চিমা ইসলাম" বা "অ্যামেরিকান ইসলাম" ধারণাকে প্রমোট করতে হবে। এর জন্য মর্ডানিস্ট ও মডারেট দা'ঈ ও আলিমদের চিহ্নিত করে তাদের বিশ্বব্যাপী প্রমোট করার কথা বলা হয়েছে। ২০১৩ সালের একটি রিপোর্টে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে "সহিষ্ণুতা ও ক্ষমা"র শিক্ষা দেওয়া মডারেট শাইখদের মাধ্যমে প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা (যাকে RAND কট্টরপন্থা বলে) মোকাবেলার ওপর জোর দেওয়া হয়।
মডারেট মুসলিমদের কর্মকাণ্ড:
মডারেট মুসলিমরা পশ্চিমা চাহিদা অনুযায়ী ইসলামের বিভিন্ন বিধান অপব্যাখ্যা বা অস্বীকার করে থাকে। যেমন—চোরের হাত কাটার বিধান, ব্যভিচারীর শাস্তি, আক্রমণাত্মক জিহাদ এবং পুরুষের একাধিক বিয়ের বিধান। এমনকি তারা মিউজিক, নারী-পুরুষের সহ-অবস্থান এবং ইসলামের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্বের মতো বিষয়গুলোকে বৈধ প্রমাণের চেষ্টা করে।
লেখকের মতে, প্রকৃত মুসলিম কখনোই কাফিরদের সন্তুষ্ট করার জন্য ইসলামের বিধানের অপব্যাখ্যা করবে না; বরং আল্লাহ প্রদত্ত সমস্ত বিধান সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেবে।