ইসলাম! একটি সার্বজনীন ধর্ম। মানুষ বাঁচার জন্য ও পৃথিবী টিকে থাকার জন্য ইসলাম সর্বকালে সর্বযুগে প্রাসঙ্গিক ও অবধারিত। ইসলাম একটি জীবন্ত ধর্ম। এর শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জীবনাচারের নানান দিক। পক্ষান্তরে আমাদের সমাজে প্রচলিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা একটি অপূর্ণাঙ্গ ও অসাড় মতবাদ। বর্তমান যুগের তথাকথিত মানবাধিকারের আওয়াজ তোলা কিছু ব্যক্তিবর্গকে বলতে শোনা যায় যে আধুনিককালে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা অকার্যকর ও ব্যাকডেটেড। আসলেই কি তাই? তাদের কথা কতোটা যৌক্তিক? একটি সুসংহত ও সুশৃংখল জীবন ব্যবস্থার প্রশ্নে ইসলাম কতোটা প্রাসঙ্গিক? তুলনামূলক আলোচনা মাধ্যমে আপনাদের সামনে তা তুলে ধরব। ইনশাআল্লাহ।
কোরআন ও সুন্নাহ তালাশ করে আমরা ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থানকে যে নামে পেয়েছি তা হচ্ছে খেলাফত। সারকথা ইসলাম হচ্ছে খেলাফত। খেলাফতই হচ্ছে ইসলাম। শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১১৭৬ হি.) বলেন, "আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে 'খিলাফতে আম্মাহ' (ইসলামি শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা) দিয়ে প্রেরণ করেছেন। এবং পুরো দুনিয়ার সকল জীবনব্যবস্থার উপর খেলাফতকে প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্বও দিয়েছেন। আল্লাহর দীনকে সকল দীনের উপর বিজয়ী করা শুধু মাত্র জিহাদ ও জিহাদের হাতিয়ার প্রস্তুত করার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হবে। আর যখন তোমরা জিহাদ ছেড়ে দিবে তখন লাঞ্চনা তোমাদের ঘিরে ফেলবে এবং সকল ধর্ম তোমাদের উপর বিজয়ী হয়ে যাবে।"
মুফতি সাইদ আহমদ পালনপুরি রহিমাহুল্লাহ এই কথার ব্যাখ্যা লেখেন, "রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ দুনিয়াতে ইসলামি খিলাফত ও শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পাঠিয়েছেন। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম কর্তৃক এই দীনের বিজয় শুধু জিহাদের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হবে। আর জিহাদ আসবাব ও উপকরনের উপর নির্ভরশীল, আর ঘোড়া হলো জিহাদের অন্যতম একটি বাহন, তাই তা প্রস্তুত করার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহিত করেছেন।"
ইসলামী খেলাফতের মূলনীতি সমূহ:
১) আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণ।
২) সকল ক্ষমতার উৎস আল্লাহ।
৩) সকল সার্বভৌমত্বের মালিক আল্লাহ।
৪) আল্লাহ প্রদত্ত সংবিধানেই রয়েছে মানবতার মুক্তি।
৫) চরম জবাবদিহিতমূলক সরকার পদ্ধতি, যারফলে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ও অপরিবর্তনীয় আইন কে কেউ নিজের স্বার্থে এক চুল পরিমাণ কিছু পরিবর্তন করতে পারবে না।
৬) আল্লাহ প্রদত্ত আইন দ্বারা বিচারকার্য নিয়ন্ত্রণ। (“যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই কাফের"-মায়িদা ৪৪) ।
৭) ওহীর বিধান কর্তৃক মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ।
৮) ইসলামী বিশ্বাসে মানুষের প্রথম উপাধি খলীফা, প্রতিনিধি। কাজেই ইসলাম ও রাজনীতি অবিচ্ছেদ্য। ইসলাম জীবনের পূর্ণাঙ্গ বিধান, তাই সবকিছুই এর অন্তর্গত।
৯) ইসলামী রাষ্ট্রের সকল মুসলিমের উপর ফরয দায়িত্ব হচ্ছে এই যে কোনো অবস্থাতেই মুসলিম ঐক্য ব্যাহত করা যাবে না। মুসলিম ঐক্য ব্যাহত করা হারাম এবং শাস্তিদায়ক।
গণতন্ত্রের মূলনীতিগুলো:
১) সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণ।
২) সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ।
৩) সার্বভৌমত্বের মালিক জনগণ।
৪) মানব রচিত সংবিধানেই রয়েছে মানবতার মুক্তি।
৫) মত প্রকাশে, ভোট দানে ও নির্বাচনে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সৎ-অসৎ নির্বিশেষে মূর্খ-জ্ঞানী, যোগ্য-অযোগ্য সকলের সমান অধিকার স্বীকৃত।
৬) কাগজে কলমে জবাবদিহিমূলক সরকার পদ্ধতি; বাস্তবে নির্বাচিত ও নিয়মতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র, সরকার নিজের স্বার্থ সাধনের জন্যে যেকোন সময়ে যেকোন আইন প্রণয়ন ও পরিবর্তন করতে পারে। ফলে সমাজে অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা আসে।
৭) মানব রচিত আইন দ্বারা বিচার কার্য নিয়ন্ত্রণ।
৮) মানব রচিত সংবিধান কর্তৃক মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত।
৯) জীবনের সর্বস্তরে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিচায়ক।
১০) গণতান্ত্রিক বিশ্বাসে ধর্ম অবশ্যয় রাজনীতি বিবর্জিত। মানব রচিত সংবিধান ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ কাজেই অনেক কিছুই এর আওতার বাইরে থেকে যায়। ফলে নিত্য নতুন আইন প্রণয়নের কোন শেষ নেই।
১১) গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকারীদল ও বিরোধীদল নামে একাধিক দলের জন্ম দিয়ে একটি রাষ্ট্রের জনগণকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দেয় এবং তারা যথাক্রমে ক্ষমতা ধরে রাখা ও ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্যে বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও উন্নয়ন বিনষ্ট করে।
আধুনিক গণতন্ত্রের জনক আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন এভাবে, 'Government of the people, by the people, for the people.'। যার অর্থ হলো-গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের অংশগ্রহণ, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য। উপরোক্ত মূলনীতিগুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে অনেক চমৎকার ও আকর্ষণীয় মনে হলেও আসলে কেবল তা ফাঁকা বুলি। কারণ আধুনিক গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য নির্ণয়ের মানদণ্ডগুলো ধোঁয়াশাবৃত হয়ে পড়েছে। যে জন্য দেশে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন এখনো চলমান। পৃথিবীর বেশির ভাগ অঞ্চলে কোনো পরিপূর্ণ শান্তির দেশ খুঁজে পাওয়া যায় না। চার দিকে কেবলই সঙ্ঘাত ও নিপীড়ন। এর মধ্যেও নিপীড়িত মানুষরা শান্তির খোঁজে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছে এবং এর নজিরও বেশ লক্ষণীয়। চীন ও রাশিয়ার সমাজতন্ত্র যেমন পৃথিবীতে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাও পৃথিবীতে শান্তির বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
পরাশক্তিগুলো প্রায়ই আন্তর্জাতিক আইন মানছে না। আবার তাদের কেউ ঠেকাতেও পারছে না। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে তারা বিদেশের মাটিতে অনুপ্রবেশ করে হত্যা, নিপীড়ন সহ মুসলিম বিশ্বের ওপর নানা ধরনের অন্যায় ও অবিচার করে চলেছে আর এর সমর্থন ও মদদ দিচ্ছে বৃহৎ পরাশক্তি ও তার মিত্ররা। যদিও এরা সবই করছে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে। রুশ সরকার সে দেশের বিরোধী দলকে কোণঠাসা করে রাখছে। ইউক্রেনের ওপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য বলপ্রয়োগ করছে, ইসরাইলের সাথে সখ্যের পাশাপাশি সিরিয়া, ভেনিজুয়েলা, লিবিয়া, বেলারুশ, তাজিকিস্তান, মালিসহ বহু একনায়কতান্ত্রিক সরকারকে সমর্থন জুগিয়ে আসছে। আমেরিকা সহ পুরো ইউরোপ গাযার বিরুদ্ধে ইজরাইল কে সমর্থন দিয়ে আসছে। চীন সরকার শুধু চীনের মুসলিমদের নিধন করে ক্ষান্ত নয় বরং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনেও তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। তাইওয়ান ও হংকংয়ের বিরুদ্ধে চলেছে তাদের আধিপত্যের মহড়া।
ভারতে মুসলিম নিধনে হিন্দুত্ববাদ আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। কাশ্মীর জ্বলছে। ফিলিস্তিন পুড়ছে। বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলমানিত্বের কবর রচনা করতে চলেছে। মিসরে বিরোধীদের ওপর যে জুলুম চলছে, তা আজ বিশ্ববাসীর অজানা নয়। চরমপন্থী আখ্যা দিয়ে তাদের ওপর দমন-নিপীড়ন চলছে। হাজার হাজার বিরোধী নেতাকর্মী আজ জেলে, তারা চাকরি হারাচ্ছে, অধিকার হারাচ্ছে, নির্মম পীড়নের শিকার হচ্ছে। মিসরীয় সরকার এরই মধ্যে বিরোধী দলের সব রকম প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেছে। শুধু তাই নয়, নিষিদ্ধ করছে পৃথিবী বিখ্যাত স্কলারদের বই, যাদের মধ্যে রয়েছেন শেখ মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওহাব, ইমাম ইবনে তাঈমিয়া, শেখ ইবনে বাজ, শেখ ইউসুফ আল কারজাভি প্রমুখ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আরেক নিষ্ঠুর অভিশাপ হলো পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা। এর ফলে সমাজে বুর্জোয়া শ্রেণীর লোকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফলে ধনীরা উত্তরোত্তর আরও ধনী হচ্ছে আর দরিদ্ররা হচ্ছে আরো দরিদ্র।
এই হলো বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার হালচিত্র। যেই মানবাধিকার ও সুশৃংখল জীবন যাপনের স্লোগান তুলে গণতন্ত্রের যাত্রা হয়েছিলো তা পূরণ করতে গণতন্ত্র সম্পূর্ন ব্যর্থ হয়েছে। গণতন্ত্র শুধু একটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নাম নয়। এটি স্বতন্ত্র একটি ধর্ম। একটি ধর্মে যা যা প্রয়োজন শিক্ষা সংস্কৃতি জীবনাচার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্বাস ও জীবন পরিচালনা ও শেষ লক্ষ্য; এ সবকিছুই আছে গণতন্ত্র নামক ধর্মে। তাইতো আজ আমরা ইউরোপীয়ান ও মার্কিনিদের কে খৃষ্ট ধর্মের প্রতি দাওয়াত দিতে দেখি না। ইউরোপে যখন রাজনীতিকে ধর্ম আলাদা ঘোষণা করা হলো সেখান থেকেই গনতান্ত্রিক ধর্মের উৎপত্তি। সারা পৃথিবীর সকল ধর্ম বর্ণ এই তন্ত্রকে মেনে নিয়ে আজ পৃথিবীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। আর এদিকে ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থায় এই সমস্ত অন্যায়-অনাচারের কোন সম্ভাবনাই নেই বরং গোড়া থেকেই সমস্যা সমাধানের কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে অপরাধের মাত্রা ও কমে যাবে বহুলাংশে। যার জ্বলন্ত প্রমাণ হলো ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান।
পুনশ্চ:
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে শরিয়া আইনের বিপরীত হিউম্যান রাইটসকে রাষ্ট্রের সংবিধান বানানো। সংবিধানে আল্লাহর হাকিমিয়ার বিপরীত ব্যাক্তির হাকিমিয়্যাত প্রতিষ্ঠা করা। আর তা প্রণয়ন করা হয় শরীয়তের সম্ভাব্য সকল পথ বন্ধ করে দিয়ে। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধানের মর্যাদা ঐ পর্যায়ে যেমন শরিয়া রাষ্ট্রে কোরআনের মর্যাদা। পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যদি হিউম্যান রাইটসের বিপরীত কোনো আইন থাকে তবে তা অগ্রহণযোগ্য। যেমন ইসলামী রাষ্ট্রে কোরআন সুন্নাহর বিপরীত কোনো আইন অগ্রহণযোগ্য।
এছাড়াও আরো অসংখ্য মৌলিক পার্থক্য ও শাখাগত হাজারো পার্থক্য রয়েছে। একটি কথা মনে রাখতে হবে যে কোনো বিষয়ের মূল ধাতুই যদি ভিন্ন হয় তাহলে বাহ্যত কোনো মিলের কারণে তা এক হয় না। একজন মানুষ ও বানরের মূলধাতুই ভিন্ন। সুতরাং কোনো মানুষের মধ্যে যদি বানরের কিছু গুনাগুন থাকে তাহলে সে মানুষ যেমন বানর হয়ে যায় না তেমনি কোনো বানরের মধ্যে মানুষসুলভ আচরণ পরিলক্ষিত হলে সে বানর মানুষ হয়ে যায় না। হতে পারে না। ঠিক এমনই ভাবে ইসলামের শাখাগত কোনো সুন্দর গনতন্ত্রের এর মধ্যে পাওয়া গেলেই তা ইসলামী বা বৈধ হয়ে যায় না। তেমনি ইসলামের কোনো সুন্দর কিছু গণতন্ত্রের মধ্যে পাওয়া গেলে তা গণতন্ত্র হয়ে যাবে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থার মর্ম বুঝে তা প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করার তৌফিক দিন আমিন।